নিজস্ব প্রতিবেদক : ইতিহাস এবং ঐতিহ্যে সমৃদ্ধশালী জেলা টাঙ্গাইল। প্রাচীনকাল থেকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রেখে আসছে এ জেলা। মোগল আমলে দেশ-বিদেশ থেকে ব্যবসায়ীরা আসতো এখানে। ব্যবসার কাজে নৌকায় করে খাল দিয়ে টাঙ্গাইল শহরে প্রবেশ করতো। কিন্তু কালের বিবর্তনে অবৈধভাবে দখল ও দূষণ এর ফলে অস্তিত্ব হারাচ্ছে টাঙ্গাইলে খালগুলো । অবৈধ দখলের ফলে বেশ কয়েকটি খালের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে, আবার অনেকগুলো খালকে ড্রেনে রুপান্তরিত করেছে টাঙ্গাইল পৌরসভা , ড্রেনের উপর মার্কেট নির্মাণ করে বিক্রিও করে দেয়া হয়েছে ।
প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি পুনরুজ্জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে খাল খনন কর্মসূচি চালু করেছিলেন। ওই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ধরে রাখা, শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজে সেচব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং সহজ যোগাযোগ ও পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলে বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি দেশের মডেল তৈরি করা । বাংদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উনার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও জলাবদ্ধতা নিরসনে দেশব্যাপী জনগুরুত্বপূর্ন খাল খনন ও পুনঃখনন এবং খালের পাড়ে বৃক্ষ রোপন কর্মসূচির উদ্ভোদন করেছেন। অবৈধ দখলের কারনে বিলীন হয়ে যাওয়া ও অস্তিত্ব হারাতে বসা টাঙ্গাইলের খালগুলো প্রধানমন্ত্রীর খাল খনন প্রকল্পের মাধ্যমে যেনো উদ্ধার হয় এমনটাই প্রত্যাশা সুধীজনদের।
তথ্য অনুযায়ী টাঙ্গাইল শহরের মোট খাল ২৭টি। এর মধ্যে তিনটি খালের অস্তিত্ব নেই। বাকি ২৪ খাল প্রভাবশালীরা নানা কৌশলে দখল করছে। খাল দখল করে নির্মাণ করেছে বড় বড় মার্কেট এবং বাসাবাড়ি। সরকারি রেকর্ডে খাল থাকলেও বাস্তবে তা দেখা খুব কষ্টকর। ফলে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। এতে করে একটু বৃষ্টি হলেই শহরের বেশির ভাগ এলাকায় জলবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এছাড়াও এসব খাল থেকে পচা দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। তাই এসব খাল উদ্ধার করে পানি প্রবাহের দাবি জানিয়েছেন শহরবাসী।
টাঙ্গাইল শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া শ্যামা বাবুর খাল নামে খ্যাত ভিক্টোরিয়া খাল পরিণত হয়েছে ড্রেনে। সেই খালের উপর মার্কেট নির্মাণ করে বিক্রিও হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) টাঙ্গাইলের জরিপ অনুযায়ী, টাঙ্গাইল পৌরসভার ১৮টি ওয়ার্ডে ২৭ খাল রয়েছে। তার মধ্যে ১ নং ওয়ার্ডের দেওলা ধুল মৌজায় ২৪২ ও ৪৯৯ দাগের দেওলা হতে কান্দিলা পর্যন্ত একটি খাল, ২ নং ওয়ার্ডের এনায়েতপুর মৌজায় ১৮৬০ দাগের মাগুরাটা হতে বৈল্লা হাটখোলা হয়ে হাজেরা ঘাট পর্যন্ত একটি খাল, ৩ নং ওয়ার্ডের কাগমারা, পশ্চিম আকুর টাকুর পাড়া মৌজার ৩২২৬, ১০৯৩, ৯০০ দাগের ও ৫৭ সিএস’র লৌহজং নদী হতে বেড়াডোমা পর্যন্ত একটি খাল, বেলকুচি রোড হতে জালাল পন্ডিতের বাড়ি পর্যন্ত একটি খাল, ৪ নং ওয়ার্ডের বেড়াডোমা, দিঘুলিয়া, পাড়দিঘুলিয়া মৌজার ২০৮, ৩৪১, ৮ সিএস এর লৌহজং নদী হতে সাটিয়া পর্যন্ত একটি খাল, বেড়াডোমা নদী হতে কাগমারা পর্যন্ত একটি খাল, দিঘুলিয়া ব্রিজের ঢাল হতে সারুটিয়া পর্যন্ত একটি খাল, ৫ নং ওয়ার্ডের সাকরাইল, কালিপুর মৌজার ১৮০ আরওআর এর লৌহজং নদী হতে সাকরাইল পর্যন্ত একটি খাল, সিএস ১৩৩৪ ও হাল ১৩২৯ এর সাকরাইল নদী হতে সন্তোষ পর্যন্ত একটি খাল, ৫০০ বিএসের সানা মিয়ার বাড়ি হইতে বকুলতলী রোড পর্যন্ত একটি খাল, ৫৩৫, ৫৩৮ ও ৯০৭ বিএসের বটতলা হতে সেন বাড়ি পর্যন্ত একটি খাল, ৪২৫ বিএসের মতিন চাকলাদারের বাড়ি হতে বেলতা ভাঙ্গাবাড়ী পর্যন্ত একটি খাল, ৬ নং ওয়ার্ডের পারদিঘুলিয়া মৌজার ৮৪, ১৪৬, ১০২, ৩৭৭, ৪০২, ৪১৯, ৬৮৮ দাগের লৌহজং নদী হতে বাকায়িার ব্রিজ পর্যন্ত একটি খাল, ৭ নং ওয়ার্ডের সন্তোষ, ভবানীপুর, পাতুলী পাড়া মৌজার ৫৪, ২৭, ৭১৯ সিএসের লৌহজং নদী হতে সন্তোষ লালব্রিজ পর্যন্ত একটি খাল, ৬০৭ সিএসের লক্ষ্মীপুর হতে সন্তোষ দিঘি পর্যন্ত একটি খাল, ৭৪৭ সিএসের সন্তোষ লালব্রিজ হতে বাগানবাড়ী পর্যন্ত একটি খাল, ৮ নং ওয়ার্ডের সন্তোষ, অলোয়া ভবানী মৌজার ৮০৬, ১০১২ সিএসের সন্তোষ লালব্রিজ হতে সন্তোষ মাদারখোলা পর্যন্ত একটি খাল, ৩, ১৪৬, ১৫৬, ১৫৭, ১৫৮, ১৮৯, ২৬৭ সিএসের সন্তোষ মাদারখোলা হতে এলাসিন রোড জোড়াব্রিজ পর্যন্ত একটি খাল, ৯ নং ওয়ার্ডের অলোয়া ভবানী ও অলোয়া তারিনী মৌজার ৭৯৮, ৮৪৯, ৯২৭ এসএ’র লৌহজং হতে এলাসিন রোডের জোড়াব্রিজ পর্যন্ত একটি খাল, ১১ নং ওয়ার্ডের কান্দাপাড়া, কচুয়াডাঙ্গা, বেড়বুচনা মৌজার ৩২৮ সিএসের বেড়াবুচনা পানির ট্যাংক হতে লৌহজং পর্যন্ত একটি খাল, ২৩৩ সিএসের দক্ষিণ বেড়াবুচনা মেইন রোড হতে অলোয়া পাইকোস্তা পর্যন্ত একটি খাল, ১৪ নং ওয়ার্ডের বিশ্বাস বেতকা মৌজার ৫৯৭, ৫৯৮, ৬০১, ৬২০ এসএ’র বাকামিয়ার ব্রিজ হতে খাদ্যগুদামের পাশ্ববর্তী ব্রিজ পর্যন্ত একটি খাল, ১৫ নং ওয়ার্ডের বিশ্বাস বেতকা মৌজার ৭১৭,৭১৯, ৪২৭, ৭৩১, ৭৩৪, ৭৩৫, ৭৭৩, ৩৯০, ৭৮৩, ৮০১, ৮০৩ এসএ’র খাদ্যগুদাম হতে বেতকা সুতার পাড়া পর্যন্ত একটি খাল, ১৭ নং ওয়ার্ডের বিশ্বাস বেতকার মৌজার ৮১৫, ৮২০, ৮৩৮, ৮৬১, ৮৬৩ এসএ’র সুতার পাড়া হতে বোরাই বিল পর্যন্ত একটি খাল, ৩০০, ২৩৬ এসএ’র মুন্সিপাড়া মসজিদ হতে প্রাইমারি স্কুল পর্যন্ত একটি খাল, ১৮ নং ওয়ার্ডের সাবালিয়া, কোদালিয়া মৌজার ২৯০, ২৪৬ সিএসের সাবালিয়া বটতলা হতে সদর হাসপাতাল পর্যন্ত একটি খাল, ৬০, ১২১, ১১৭ এসএ’র সদর হাসপাতাল হতে কোদালিয়া শেষ সীমানা পর্যন্ত একটি খাল। এছাড়া ১০, ১২, ১৩ ও ১৬ নং ওয়ার্ডে কোন খাল নেই।
টাঙ্গাইল পৌরসভার ৩ নং ওয়ার্ডের কাগমারা, পশ্চিম আকুর টাকুর পাড়া মৌজায় ৩২২৬, ১০৯৩, ৯০০ দাগের ও ৫৭ সিএস’র লৌহজং নদীর বেলকুচি রোড হতে জালাল পণ্ডিতের বাড়ি পর্যন্ত একটি খাল, ১১ নং ওয়ার্ডের কান্দাপাড়া, কচুয়াডাঙ্গা, বেড়বুচনা মৌজার ৩২৮ সিএসের বেড়াবুচনা পানির ট্যাংক হতে লৌহজং পর্যন্ত একটি, ২৩৩ সিএসের দক্ষিণ বেড়াবুচনা মেইন রোড হতে অলোয়া পাইকোস্তা পর্যন্ত ও ১৮ নং ওয়ার্ডের সাবালিয়া, কোদালিয়া মৌজার ২৯০, ২৪৬ সিএসের সাবালিয়া বটতলা হতে সদর হাসপাতাল পর্যন্ত, ৬০, ১২১, ১১৭ এসএ’র সদর হাসপাতাল হতে কোদালিয়া খালসহ মোট তিনটি খালের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
এদিকে সাবালিয়া খালটি টাঙ্গাইল শহরের ময়মনসিংহ সড়কের বায়তুন নূর জামে মসজিদের পাশ থেকে সাবালিয়া পাঞ্জাপাড়া হয়ে সাবালিয়া বটতলা কালবার্ট হয়ে বৈরান নদীতে সংযোগ হয়েছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে একটি প্রভাবশালী মহল প্রথমে ময়লা আর্বজনা দিয়ে খালটি কৌশলে ভরাট করে তারপর প্রথমে টিন দিয়ে সীমানা প্রাচীর গড়ে তুলে। কিছুদিন যাওয়ার পর সেখানে ইট দিয়ে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করেন। আর কয়েক বছর যাওয়ার পর সেই সীমানা প্রাচীর ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়। এভাবেই বহুতল ভবন নির্মাণ করে সাবালিয়া খালের চিহ্ন মুছে ফেলা হয়েছে।
সরেজমিন জমিন গিয়ে দেখা যায়, খালের ওপর সীমানা প্রাচীর, আধা-পাকা ঘর, টিনশেড ঘর ও বহুতল ভবন নির্মাণ করেছে প্রভাবশালীরা। খালের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভালো না থাকায় বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা ও দুগন্ধের সৃষ্টি হচ্ছে। এ দিকে সরকারি কুমুদিনী কলেজ গেট-সুরুজ সড়কের সাবালিয়া বটতলা এলাকায় খালের ওপর কালভার্ট থাকলেও দক্ষিণ পাশে খাল চেনার কোনো উপায় নেই। যে যার মতো পেরেছে খালের জায়গা দখল করেছে। কালবার্টের দক্ষিণ পাশে রফিকুল ইসলাম নামে একজন সীমানা প্রাচীর ও বহুলতল ভবন নির্মাণ করায় খালের কোনো চিহ্ন নেই। শুধু তিনিই নন। তার মতো সাইদুর রহমান, ইদু মিয়া, মো. হারুন মিয়া ও জাহাঙ্গীর মিয়াও খালের জায়গা দখল করে সীমানী প্রাচীরসহ বহুতল ভবণ নির্মাণ করেছেন। এ ছাড়াও খালের ওপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করেছেন টাঙ্গাইল পৌরসভা। রাস্তার পাশ দিয়ে ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে। অন্যদিকে বেলকুচি রোড হতে জালাল পণ্ডিতের বাড়ি পর্যন্ত খাল, মুন্সিপাড়া মসজিদ হতে প্রাইমারি স্কুল পর্যন্ত খাল, সাবালিয়া বটতলা হতে সদর হাসপাতাল হয়ে কোদালিয়া খালের অস্তিত্ব নেই।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড টাঙ্গাইল জেলা অফিস থেকে সম্প্রতি খালের একটি তালিকা প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন। তালিকায় টাঙ্গাইলের ১২ উপজেলায় ৬২ টি খাল উল্লেখ করা হয়েছে, তবে এই তালিকায় পৌর এলাকার খালগুলো নেই। এছাড়াও গোপালপুরে গোলাবাড়ি খাল,নাগরপুরে নোয়াই খাল ও মির্জাপুরে ফতেপুর খালের পুনঃখনন কাজ চলমান আছে বলে টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ড সুত্রে জানা যায়।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) টাঙ্গাইলের ঊর্ধ্বতন গবেষণা কর্মকর্তা গৌতম চন্দ্র চন্দ বলেন, শহরের ২৭টি খালের বিষয়ে প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে। নদী, খাল, বিল ও জলাশয় উদ্ধারে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা রয়েছে। এছাড়াও হাইকোর্টের দিকনির্দেশনা রয়েছে।
সামাজিক ও পরিবেশবাদী সংগঠন সেফ লাইফ এর সভাপতি মোঃ রুবেল মিয়া বলেন,প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি পুনরুজ্জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে খাল খনন কর্মসূচি চালু করেছিলেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর খাল খনন প্রকল্পের মাধ্যমে বিলীন হয়ে যাওয়া খালগুলো যেনো উদ্ধার হয় এমনটাই প্রত্যাশা
টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ মাঈন উদ্দিন বলেন, টাঙ্গাইল জেলার বিভিন্ন খালের তালিকা মন্ত্রণালয় বরাবর পাঠানো হয়েছে, প্রকল্প অনুমোদন হওয়ার পর বরাদ্দ এলে প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে।
Leave a Reply